যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সংকট মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত পিছু হটছেন এমন মন্তব্যই এখন জোরালোভাবে উঠছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে অনেকেই দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের একপ্রকার কৌশলগত আত্মসমর্পণ হিসেবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের সঙ্গে একটি লেটার অব ইন্টেন্ট বা সমঝোতা চিঠি নিয়ে আলোচনা করছে। এই চুক্তির আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ৩০ দিনের আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত সংঘাত থেকে সরে আসছে। আমেরিকানরা পরাজয়ের ভয়াবহতা টের পাওয়ার আগেই তিনি ইরান থেকে সরে পড়তে চাচ্ছেন এমনই ধারণা বিশ্লেষকদের। ট্রাম্প হয়তো নিজের অবস্থান শক্ত দেখাতে সীমিত আকারে আরেকটি সামরিক হামলা চালাতে পারেন, তবে সেটিকে মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সংকটের সূত্রপাত হয় গত মার্চে, যখন ইসরাইল ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান কাতারের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদন স্থাপনায় আঘাত হানে। এরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানায় এবং কার্যত সংঘাত থেমে যায়।
বিশ্লেষকদের দাবি, গত দুই মাস ধরে তেহরান বিশ্বাস করে আসছে যে ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুনরায় শুরু করবেন না। তাই টানা ৩৭ দিনের হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরান কোনো বড় ছাড় দেয়নি। বরং দেশটি যুদ্ধক্ষতিপূরণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো কঠোর শর্ত সামনে এনেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো সুসংহত করছে। তেহরান বিভিন্ন তেল আমদানিকারক দেশের সঙ্গে পৃথক ট্রানজিট চুক্তি করছে এবং যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি নেই, তাদের জাহাজের ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ করছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্র দেশগুলো অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও আলাদা ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। তবে ইরানের দৃষ্টিতে বিরোধী দেশগুলোর জাহাজকে পুরোপুরি প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হতে পারে।
খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ইরাক ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী ট্রানজিট চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে সামরিক পদক্ষেপ নেবে না এটি স্পষ্ট হওয়ার পর আরো অনেক দেশ দ্রুত তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাইবে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে ইরানের প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই সংকটের গুরুত্ব আড়াল করতে অন্য ইস্যু সামনে আনতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে কিউবা ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার শুরু করেছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থানে উঠে আসতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান বড় ধরনের চাপে পড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য আটলান্টিক
খুলনা গেজেট/এএজে

